বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, আমার খুব’ই কাছের বড় ভাই; তিনি আমাকে ভয়ানক পছন্দ করেন

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নানান বিষয়ে তিনি আমাকে পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তিনি ক্যানাডায় থাকেন এখন।আমি জানি, তিনি সব সময় আমার ভালোর জন্য’ই পরামর্শ দেন। গতকাল আমাকে ফোন করে বলছেন -টুটুল (আমার ডাক নাম), তোমার কি এইসব করা ঠিক হচ্ছে?-কেন ভাই, আবার কি করলাম!-এই যে কোন এক পেইজের মাধ্যমে তুমি ছেলেপেলেদের পরামর্শ দিচ্ছ, এইটার কোন মানে আছে?-সমস্যাটা কোথায়?-তোমার যে সামজিক অবস্থান, তোমার কি এইসব করা মানায়?-আমি ভুলটা কি করলাম?-যে কেউ তোমার সঙ্গে সহজে কথা বলতে পারছে; এটা ঠিক হচ্ছে না। তোমার তো একটা ওজন থাকা উচিত।

এরপর তিনি খুব গম্ভীর হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন-তুমি যে চাকরি করো, প্রতি ঘণ্টায় তোমার সেলারি কতো?-আমার সেলারি তো ঘণ্টায় দেয় না।-ঘণ্টায় হিসাব করলে কতো হবে?-পরিমাণটা যথেষ্ট। -তাহলে তুমি এইসব ফালতু কাজ করছ কেন?-ভাই, আমি তো কাজটা বিনা পারিশ্রমিকে করছি। আমার দিক থেকে তো পুরোপুরি ভলেণ্টারি। মানসিক অবসাদে ভুগছিলাম, এই জন্য ভাবলাম নতুন নতুন মানুষজনের সাথে কথা বলি।-তোমার এইসব করা ঠিক হচ্ছে না। মানুষজন কি ভাবছে বলো তো? এইসব আলতু ফালতু কাজ করা বাদ দাও। তোমার সময়ের তো মূল্য আছে।

এর খানিক বাদে কথা প্রসঙ্গে-এই যে আজ (মানে গতকাল) ফেসবুকে গান আপলোড দিলে; ভালো কথা, এভাবে আপলোড দেয়ার কোন দরকার ছিল?-কেন ভাই, এইখানে আবার কি ভুল করলাম?-এমন তো না, তুমি গান জানো না। গান গাওয়া তো তুমি অনেক আগেই শিখেছ; গান যদি আপলোড দিতেই হয়, ভালো করে প্র্যাকটিস করে এরপর আপলোড দিবে।-কেন ভাই?-নইলে মানুষজন কি ভাবছে বলো তো? তাছাড়া একটু ভালো ভাবে বসে, নিজেকে একটু ভালো করে রিপ্রেজেন্ট করবে। তোমার একটা সামাজিক অবস্থান আছে। এভাবে ভিডিও আপলোড দেয়ার কোন মানে হয় না। আর এইসব ফেসবুক লাইভের মানে কি? তুমি কি তোমার পারিবারিক, সামাজিক অবস্থান জানো না?
আমি অতি অবশ্য’ই জানি- আমার এই বড় ভাই আমার ভালো চান। তিনি বরাবর’ই ভালোর জন্য আমাকে নানান পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তবে আমাদের মাঝে মতের নানান অমিল আছে। আমরা নিয়ম করে ঝগড়াও করি। কাল উনার এতসব পরামর্শ শুনার পর বলেছি-আচ্ছা ভাই শুনলাম। এখন কিছু বলতে পারব না। সময় করে লিখে জবাব দিব।

আমি জীবনভর ভেবে এসছি- জীবনকে আমি আমার মতো করেই উপভোগ করবো সীমার মাঝে থেকে। যা ইচ্ছে হয় করবো। অন্য কারো সমস্যা না হলেই তো হয়। গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কিছু ছেলেপেলের সাথে কথা বলেছি। ওদের গল্প শুনেছি দিনে এক ঘণ্টা সময় দিয়ে। নানান পরামর্শ দেবারও চেষ্টা করেছি। মানসিক অবসাদ দূর করার জন্যই করেছি। আমি জানি, এক-দুই সপ্তাহ পর আমি নিজেই হয়ত আর সেই অর্থে সময় দিতে পারব না।এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এভাবে কথা বললেই বা সমস্যা কোথায়?সামাজিক অবস্থান ভালো হলেই খাঁচায় ঢুকে বসে থাকতে হবে?

আপনাদের ঢুকতে হয়, আপনারা ঢুকে থাকেন। আমি আজীবন চেয়েছি এইসব থেকে দূরে থাকতে। যখন যা ইচ্ছে করবো। যার সাথে ইচ্ছে হয় কথা বলবো।কতো মানুষকে দেখলাম ভালো একটা চাকরি পাওয়ার পর আর বন্ধু বান্ধবদের চেনে না!নিজেদের অবস্থান একটু ভালো হবার পর আশপাশের মানুষদের আর মানুষ’ই মনে করছে না; এমন কতো মানুষ আমি নিজেই রোজ দেখি!কতো মানুষকে দেখলাম জীবনভোর টাকা-পয়সা, ভালো চাকরি, প্রমোশনের পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। জীবনে বড় হতে হবে না! একটা সময় জীবন’টাই তাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে!

আবার আশপাশের কতো মানুষকে দেখছি হাহুতাশ করে বেড়াচ্ছে- আহা এক জীবনে কোন আশা’ই পূরণ হলো না। নিজের ইচ্ছা মতো কিছুই করতে পারলাম ইত্যাদি না বলে বেড়াচ্ছে! কোন কিছু করতে গেলেই- সমাজ কি বলবে! আশপাশের মানুষ কি বলবে!একটা গান নিজের মতো করে যেভাবে ইচ্ছে, সেভাবে গেয়ে আপলোড দিলাম- এতেও সমস্যা? মানুষজন কি ভাববে!নিজের ইচ্ছে মতো কিছু’ই করা যাবে না?থাকুন আপনারা আপনাদের এই জীবন নিয়ে।

আমার যখন যা ইচ্ছে হয় করবো। বেসুরো গলায় গাইতে ইচ্ছে হলে গাইবো। রাস্তায় গীটার বাজিয়ে ভিক্ষা করতে ইচ্ছে হলে, করবো। রাতভর জেগে পুরো দিন ঘুমাতে ইচ্ছে করলে, করবো। অপরিচিত যে কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করলে, করবো। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে সুমদ্রের ধারে হাঁটতে ইচ্ছে করলে, করবো। সন্ধ্যার মিলিয়ে যাওয়া আলোয় পাশের আধো-আলো রেস্তরাঁয় খেতে ইচ্ছে করলে, খাবো। কোন রেস্তরাঁয় ওয়েটার হিসেবে কাজ করতে ইচ্ছে করলে, করবো। রাতের শেষ ট্রাম ধরে কোথাও হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করলে, যাবো।

পৃথিবীতে আমরা মানুষরা খুব কম সময়ের জন্য আসি। কার কবে যাবার সময় আসবে, কেউ জানি না। মানুষ কি বলবে, সমাজ কি বলবে; এই জন্য ছোট-খাটো ইচ্ছে গুলোও পূরণ করবো না? আমরা মানুষরা এক জীবনে বেশিরভাগ ইচ্ছা’ই পূরণ করতে পারি না। তাই বলে ছোট ইচ্ছে, যে গুলো পূরণ করা যায়; মানুষ কি বলবে, এই ভেবে পূরণ করবো না? আমি আজীবন বিশ্বাস করে এসছি- জীবন একটা’ই। তাই সীমার মাঝে থেকে আমি আমার মতো করে জীবনকে উপভোগ করবো। আপনারা থাকুন খাঁচায় বন্দি হয়ে।

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *